Free

আদিবাসী এবং উপজাতির মধ্যে পার্থক্য কী? বাংলাদেশ সরকার কেন তাদের আদিবাসী না বলে উপজাতি বলে?

Administrator 07 August 2026

আদিবাসী (Indigenous Peoples) এবং উপজাতি (Tribal Peoples)—দুটি শব্দ কাছাকাছি হলেও আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এক নয়। আবার বাংলাদেশে এই পরিভাষা নিয়ে রাষ্ট্রীয় অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়ের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

আদিবাসী ও উপজাতির পার্থক্য

বিষয়আদিবাসী (Indigenous)উপজাতি (Tribal)
মূল ধারণাকোনো ভূখণ্ডে উপনিবেশ স্থাপন/আধুনিক রাষ্ট্রসীমা প্রতিষ্ঠার পূর্ববর্তী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাবৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী
ঐতিহাসিক সম্পর্কভূমি ও পূর্বপুরুষের সঙ্গে দীর্ঘ ঐতিহাসিক যোগসূত্র গুরুত্বপূর্ণ‘প্রথম বাসিন্দা’ হওয়া অপরিহার্য নয়
নিজস্ব প্রতিষ্ঠাননিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বজায় থাকতে পারেনিজস্ব রীতি, প্রথা, সামাজিক ব্যবস্থা বা customary law থাকতে পারে
আত্মপরিচয়নিজেকে Indigenous হিসেবে চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্যনিজেকে Tribal হিসেবে চিহ্নিত করাও গুরুত্বপূর্ণ
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডILO Convention 169-এর Article 1(b)ILO Convention 169-এর Article 1(a)

ILO নিজেই বলছে Indigenous-এর সর্বজনস্বীকৃত একক সংজ্ঞা নেই। ILO Convention 169-এ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার পাশাপাশি self-identification বা আত্মপরিচয়কে fundamental criterion হিসেবে ধরা হয়েছে। (Normlex)

বাংলাদেশ সরকার কেন ‘আদিবাসী’ না বলে অন্য পরিভাষা ব্যবহার করে?

এখানে প্রথমে একটি সংশোধন গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে শুধু ‘উপজাতি’ শব্দ ব্যবহার করে—এভাবে বলা পুরোপুরি ঠিক নয়। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৩ক (23A)-তে বলা হয়েছে:

“উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়”

এবং রাষ্ট্রকে তাদের স্বতন্ত্র স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা ও বিকাশের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

এমনকি ২৮ এপ্রিল ২০২৬ জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্যেও “ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়” পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। (Ministry of Foreign Affairs)

সরকারের ঐতিহাসিক অবস্থানের পেছনে প্রধানত কয়েকটি যুক্তি দেওয়া হয়েছে:

১. ‘Indigenous’ হিসেবে পৃথক সাংবিধানিক স্বীকৃতি সরকার গ্রহণ করেনি।
২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ২৩ক অনুচ্ছেদ যুক্ত করার সময় ‘Indigenous/আদিবাসী’ না লিখে tribes, minor races, ethnic sects and communities লেখা হয়। (Bangladesh Laws)

২. সরকার ঐতিহাসিকভাবে দাবি করেছে যে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোকে আন্তর্জাতিক অর্থে আলাদাভাবে ‘মূল/আদি জনগোষ্ঠী’ হিসেবে চিহ্নিত করা যথার্থ নয়। অর্থাৎ কারা কোন সময়ে বর্তমান বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছে—এ নিয়ে সরকারের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা আছে। তবে এই ব্যাখ্যা বিতর্কিত এবং সংশ্লিষ্ট অনেক জনগোষ্ঠী ও গবেষক এর সঙ্গে একমত নন। (The Daily Star)

৩. আন্তর্জাতিক আইনে ‘Indigenous Peoples’ স্বীকৃতির সঙ্গে বিশেষ collective rights-এর প্রশ্ন যুক্ত। ভূমি, সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সম্পদ, অংশগ্রহণ ও self-determination-এর মতো অধিকার UNDRIP-এ উল্লেখ আছে। বাংলাদেশ ২০০৭ সালে UNDRIP গৃহীত হওয়ার ভোটে পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট না দিয়ে abstain করেছিল। (United Nations)

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পাল্টা দিকও আছে: বাংলাদেশ ILO Convention No. 107 on Indigenous and Tribal Populations ১৯৭২ সালে অনুসমর্থন করেছে এবং এটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখনও কার্যকর। (Normlex) তাই বিষয়টি শুধু “বাংলাদেশে আদিবাসী নেই”—এই এক বাক্যে আইনগত ও নীতিগতভাবে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না।

ভাইভায় ভারসাম্যপূর্ণ উত্তর

“স্যার, আদিবাসী বলতে সাধারণভাবে এমন জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয় যাদের বর্তমান রাষ্ট্রসীমা বা উপনিবেশ স্থাপনের পূর্ববর্তী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে এবং যারা নিজেদের স্বতন্ত্র সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ধরে রেখেছে। অন্যদিকে উপজাতি বলতে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্বতন্ত্র এবং নিজস্ব প্রথা ও রীতিনীতিসম্পন্ন জনগোষ্ঠীকে বোঝায়। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে ‘আদিবাসী’ শব্দের পরিবর্তে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ বলা হয়েছে। সরকারের ঐতিহাসিক অবস্থান হলো, বাংলাদেশের এসব জনগোষ্ঠীকে আন্তর্জাতিক অর্থে পৃথক Indigenous Peoples হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে সাংবিধানিকভাবে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। তবে সংশ্লিষ্ট অনেক জনগোষ্ঠী নিজেদের আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দেন এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।”

এক লাইনে মনে রাখুন:
Indigenous → Historical continuity + Self-identification
Tribal → Distinct culture/custom/social system
Bangladesh Constitution → “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়” (অনুচ্ছেদ ২৩ক)।


আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিলে কি বাঙালিগণ দেশের বসবাসের জন্য অবৈধ হয়ে যাবে?

না—কোনো জনগোষ্ঠীকে “আদিবাসী/Indigenous Peoples” হিসেবে স্বীকৃতি দিলেই বাঙালিরা বাংলাদেশে অবৈধ বাসিন্দা হয়ে যাবে—এ ধারণা আইনগতভাবে সঠিক নয়।

Indigenous হিসেবে স্বীকৃতির অর্থ সাধারণত সেই জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র পরিচয়, সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য, অংশগ্রহণ এবং ঐতিহ্যগত ভূমির সঙ্গে সম্পর্কের বিশেষ অধিকার স্বীকার করা। UNDRIP-এর ২৬ অনুচ্ছেদে Indigenous Peoples-এর ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানাধীন বা ব্যবহৃত ভূমি ও সম্পদের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে একই রাষ্ট্রের অন্য নাগরিকদের নাগরিকত্ব বা বৈধ বসবাসের অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। (United Nations)

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, UNDRIP-এর Article 46(1) স্পষ্ট করে যে Indigenous Peoples-এর অধিকারকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না, যা কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের territorial integrity বা political unity ভেঙে দেওয়ার অধিকার সৃষ্টি করে। অর্থাৎ Indigenous recognition নিজে থেকে আলাদা রাষ্ট্র সৃষ্টি বা অন্য জনগোষ্ঠীকে “বিদেশি/অবৈধ” বানানোর আইনি ভিত্তি নয়। (United Nations Legal Affairs)

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং অনুচ্ছেদ ২৮ অনুযায়ী রাষ্ট্র শুধু ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের কারণে নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করতে পারে না। একই সঙ্গে অনুচ্ছেদ ২৩ক-তে “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়”-এর স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ একটি জনগোষ্ঠীর বিশেষ সাংস্কৃতিক অধিকার স্বীকৃতি এবং অন্য নাগরিকের নাগরিকত্ব—দুটি পৃথক বিষয়।

তবে ভূমির অধিকারের প্রশ্নে বাস্তব আইনি প্রভাব থাকতে পারে। কোনো জনগোষ্ঠীকে Indigenous হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তাদের ঐতিহ্যগত ভূমি, customary land tenure, উচ্ছেদ, ভূমি অধিগ্রহণ বা সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে বাড়তি আইনি সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু সেটিও নির্দিষ্ট ভূমির অধিকার ও সংশ্লিষ্ট আইনের বিষয়—“সব বাঙালি অবৈধ হয়ে যাবে” এমন কোনো সাধারণ আইনি ফল নয়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ILO Convention No. 107 ratify করেছে, যা Indigenous এবং Tribal populations—উভয় সম্পর্কেই অধিকার ও সুরক্ষার বিধান রাখে। (Normlex)

বিসিএস ভাইভায় উত্তর

“স্যার, না। কোনো জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ এই নয় যে বাঙালিরা বাংলাদেশের অবৈধ বাসিন্দা হয়ে যাবে। Indigenous recognition মূলত সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর পরিচয়, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ঐতিহ্যগত ভূমির অধিকারকে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়। UNDRIP-এর Article 46-ও স্পষ্ট করেছে যে এ ধরনের অধিকার কোনো রাষ্ট্রের territorial integrity বা political unity ক্ষুণ্ন করার অধিকার দেয় না। কাজেই নাগরিকত্ব ও বৈধ বসবাসের প্রশ্ন এক বিষয়, আর Indigenous Peoples-এর collective rights আরেক বিষয়। তবে ভূমি ও সম্পদের অধিকারের ক্ষেত্রে স্বীকৃতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রভাব থাকতে পারে।”