Free

ভু-রাজনীতিতে চিকেন নেক এর প্রভাব কী?

Administrator 21 August 2026

ভূরাজনীতিতে ‘চিকেন নেক’-এর প্রভাব

শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেন নেক’ দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত সংকীর্ণ পথ বা Strategic Chokepoint। এটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর প্রধান স্থলসংযোগ হওয়ায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

১. ভারতের কৌশলগত দুর্বলতা

করিডরটি সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে প্রায় ২০–২২ কিলোমিটার প্রশস্ত। কোনো যুদ্ধ, অবরোধ বা বড় ধরনের নাশকতায় এটি অচল হলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সড়ক ও রেল যোগাযোগ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই একে ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত দুর্বলতা বলা হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

২. চীন–ভারত প্রতিযোগিতা

করিডরটির উত্তরে সিকিম, ভুটান এবং চীনের তিব্বত ও চুম্বি উপত্যকা অবস্থিত। বিশেষ করে ডোকলাম মালভূমিতে চীনের সামরিক বা অবকাঠামোগত উপস্থিতি বৃদ্ধি পেলে ভারত চিকেন নেকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়। তাই ডোকলামকে কেন্দ্র করে চীন–ভারত উত্তেজনার সঙ্গে এই করিডরের সরাসরি কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে।

৩. বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি

করিডরটির দক্ষিণে বাংলাদেশ অবস্থিত। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সড়ক, রেল ও নৌ ট্রানজিট ব্যবহার করলে ভারত শিলিগুড়ি করিডরের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সহজে পৌঁছাতে পারে। ফলে ভারতের “Act East Policy” এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নে বাংলাদেশের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংক

তবে এটিকে শুধু বাংলাদেশের কৌশলগত চাপ প্রয়োগের উপায় হিসেবে না দেখে পারস্পরিক নির্ভরতা ও অর্থনৈতিক সুবিধার ক্ষেত্র হিসেবে দেখা উচিত।

৪. উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা ও সংহতি

উত্তর-পূর্ব ভারতের আটটি রাজ্যে জনগণ, পণ্য, সামরিক সরঞ্জাম ও প্রশাসনিক সহায়তা পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এই করিডর। তাই ভারতের জাতীয় সংহতি ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

৫. সামরিকীকরণ ও সংঘাতের ঝুঁকি

করিডরের গুরুত্বের কারণে ভারত এর আশপাশে সামরিক ঘাঁটি, বিমান প্রতিরক্ষা, সড়ক, রেলপথ ও নজরদারি সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এর ফলে নিরাপত্তা শক্তিশালী হলেও চীন–ভারত প্রতিযোগিতা এবং আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা বেড়ে যেতে পারে।

৬. বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব

শিলিগুড়ি করিডর দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতে বিপুল পরিমাণ খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন করা হয়। এখানে যোগাযোগ বিঘ্নিত হলে পরিবহন ব্যয়, পণ্যের মূল্য এবং সরবরাহসংকট বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বিকল্প যোগাযোগ ব্যবহার করলে দূরত্ব ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। যেমন, আগরতলা থেকে কলকাতা শিলিগুড়ি হয়ে প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার, কিন্তু বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার। বিশ্বব্যাংক

৭. আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক একীকরণ

চিকেন নেক বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু। ফলে BBIN ও BIMSTEC-এর মতো আঞ্চলিক সহযোগিতা কার্যকর করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৮. ভারতের বিকল্প পথ অনুসন্ধান

করিডরের ওপর নির্ভরতা কমাতে ভারত—

  • বাংলাদেশের সড়ক, রেল ও নৌপথ ব্যবহার;

  • চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের ব্যবহার;

  • কালাদান মাল্টিমোডাল প্রকল্প;

  • উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নতুন সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ—এ ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে।

এতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৯. ছোট রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব

চিকেন নেক দেখায় যে শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি নয়, একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থানও তাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে। বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটান বড় শক্তিগুলোর আঞ্চলিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মূলত তাদের অবস্থানের কারণে।

ভাইভায় বলার মতো সংক্ষিপ্ত উত্তর

“শিলিগুড়ি করিডর বা চিকেন নেক ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান স্থলসংযোগ হওয়ায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত Chokepoint। এর কারণে চীন–ভারত প্রতিযোগিতা ও ডোকলামের সামরিক গুরুত্ব বেড়েছে। পাশাপাশি বিকল্প ট্রানজিট, বন্দর ও যোগাযোগপথ হিসেবে বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি BBIN ও BIMSTEC অঞ্চলের বাণিজ্য ও যোগাযোগে সুযোগ সৃষ্টি করলেও অতিরিক্ত সামরিকীকরণ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার ঝুঁকিও বাড়ায়। তাই চিকেন নেক একই সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তাগত দুর্বলতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।”