জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি ছিল মূলত বাস্তববাদী, জাতীয় স্বার্থভিত্তিক, বহুমুখী ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকেন্দ্রিক। তাঁর লক্ষ্য ছিল ভারত ও সোভিয়েত বলয়ের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ, মুসলিম বিশ্ব, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সম্প্রসারণ করা। তবে তিনি ভারত বা সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করেননি; প্রয়োজনীয় কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।
তাঁর সময়ে সংবিধানের ২৫(২) অনুচ্ছেদে মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক সুদৃঢ় করার নীতি যুক্ত করা হয়। Banglapedia
উল্লেখযোগ্য দেশ সফর ও অর্জন
তাই নিচে সবচেয়ে বেশি নথিবদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ সফরগুলো দেওয়া হলো।
| দেশ/অঞ্চল | সফর ও প্রধান কাজ |
|---|---|
| চীন | ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পূর্ণাঙ্গ বিদেশ সফর করেন এবং ১৯৮০ সালের জুলাইয়ে আবার চীন যান। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয় সফরে ঋণ ও বিমান চলাচলসংক্রান্ত চুক্তি হয়। বাংলাদেশ দূতাবাস, বেইজিং |
| ভারত | ১৯৭৭ সালের ১৯–২০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় এবং ১৯৮০ সালের ২১ জানুয়ারি দ্বিপক্ষীয় সফর করেন। গঙ্গার পানি বণ্টন, সীমান্ত, নিরাপত্তা ও দ্বিপক্ষীয় আস্থা নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর সরকারের সময়ে ১৯৭৭ সালের পাঁচ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। The Daily Star |
| মিয়ানমার | ১৯৭৭ সালের ২০ জুলাই দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফর করেন। ১৯৭৮ সালে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এলে বিষয়টি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মহলে তোলা হয়। ১৯৭৮ সালের জুলাইয়ে প্রত্যাবাসন চুক্তি হয় এবং ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সেই দফার প্রত্যাবাসন শেষ হয়। UNHCR |
| সৌদি আরব | ১৯৭৭ সালের জুলাইয়ে সরকারি সফর এবং ১৯৮১ সালে মক্কা-তায়েফে তৃতীয় ইসলামি শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন। সৌদি সাহায্য, ঋণ, জ্বালানি সহযোগিতা ও বাংলাদেশি জনশক্তির কর্মসংস্থান বৃদ্ধির চেষ্টা করেন। Arab News |
| পাকিস্তান | ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরে সফর করেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ, বাণিজ্য এবং অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি পাকিস্তান সফরকারী প্রথম বাংলাদেশি রাষ্ট্রপ্রধান। |
| ইরান | সরকারি সফরে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাংলাদেশি জনশক্তি পাঠানোর উদ্যোগ নেন। পরে ইরান–ইরাক যুদ্ধ বন্ধে OIC-এর শান্তি উদ্যোগে অংশ নেন। |
| ইরাক ও কুয়েত | তেল, আর্থিক সহায়তা, বাণিজ্য, জনশক্তি রপ্তানি ও মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে সফর ও উচ্চপর্যায়ের আলোচনা করেন। |
| মিশর | মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে অভিন্ন অবস্থান তৈরির চেষ্টা করেন। |
| জাপান | ১৯৭৮ সালের এপ্রিলে সরকারি সফর করেন। উন্নয়ন সহায়তা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো সহযোগিতা বৃদ্ধির চেষ্টা করেন। ১৯৮০ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী মাসায়োশি ওহিরার স্মরণানুষ্ঠানেও যোগ দেন। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় |
| সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া | ১৯৭৮ সালে সফর করেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উন্নয়ন অভিজ্ঞতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও ASEAN দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ ছিল মূল উদ্দেশ্য। |
| থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া | ১৯৭৯ সালে সফর করেন। মালয়েশিয়ার সঙ্গে বিমান চলাচল ও বাণিজ্য চুক্তি হয়; পরবর্তীতে বাংলাদেশি জনশক্তির জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার ভিত্তি তৈরি হয়। The Washington Post |
| ফিলিপাইন | ১৯৮০ সালের ২৫–২৭ মে রাষ্ট্রীয় সফর করেন। বাণিজ্য, কৃষি, প্রযুক্তি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করেন। |
| যুক্তরাজ্য | ১৯৭৭ সালে কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের সম্মেলনে এবং ১৯৮০ সালে সরকারি সফরে যান। মার্গারেট থ্যাচারের সঙ্গে আফগানিস্তান, উন্নয়ন সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। |
| ফ্রান্স | ১৯৮০ সালের আগস্টে সফর করেন। আর্থিক সহযোগিতা এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি—বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প—সংক্রান্ত দুটি চুক্তি হয়। |
| যুক্তরাষ্ট্র | ১৯৮০ সালের ২৫–২৭ আগস্ট জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশনে যোগ দেন এবং প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে বৈঠক করেন। উন্নয়ন সহায়তা, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, আফগানিস্তান ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়। তিনি দরিদ্র দেশগুলোর জন্য কম দামে তেল এবং উন্নয়নশীল দেশে OPEC-এর বিনিয়োগ দাবি করেন। US Office of the Historian |
| নেপাল ও শ্রীলঙ্কা | দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার ধারণা নিয়ে নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করেন। এসব উদ্যোগ পরে SAARC গঠনের ভিত্তি তৈরি করে। |
| সেনেগাল | ১৯৮১ সালের মার্চে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর করেন। আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব, মুসলিম সংহতি ও জোটনিরপেক্ষ সহযোগিতা সম্প্রসারণ করেন। The Business Standard |
| মরক্কো | ১৯৮১ সালের এপ্রিলে রাবাতে আল-কুদস কমিটির বৈঠকে যোগ দেন। ফিলিস্তিন ও জেরুজালেম প্রশ্নে ৩০ দফা সুপারিশ তৈরিতে অংশ নেন। |
| অন্যান্য সফর | নেদারল্যান্ডস, তুরস্ক, যুগোস্লাভিয়া, উত্তর কোরিয়া, পশ্চিম জার্মানি, কিউবা ও জাম্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয়, শুভেচ্ছা বা আন্তর্জাতিক সম্মেলনভিত্তিক সফর করেন। এগুলোর উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিধি সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন সহযোগিতা সংগ্রহ। সফরগুলোর একাংশের তালিকা পাওয়া যায় সমসাময়িক গবেষণায়। Sabiha Hasan, Foreign Policy of Bangladesh–II |
তিনি যেসব ধরনের ডিপ্লোম্যাসি প্রয়োগ করেছিলেন
১. Balancing Diplomacy: ভারত–সোভিয়েত বলয়ের পাশাপাশি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে শক্তির ভারসাম্য সৃষ্টি করেন।
২. Economic Diplomacy: বৈদেশিক সাহায্য, ঋণ, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও জ্বালানি সংগ্রহকে পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য করেন।
৩. Manpower Diplomacy: সৌদি আরব, ইরান, উপসাগরীয় দেশ ও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর উদ্যোগ নেন; এর ফলে রেমিট্যান্সের নতুন ভিত্তি তৈরি হয়।
৪. Regional Diplomacy: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। ১৯৮০ সালের মে মাসে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠান; এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮৫ সালে SAARC গঠিত হয়।
৫. Multilateral Diplomacy: জাতিসংঘ, OIC, NAM ও Commonwealth-কে বাংলাদেশের স্বার্থ আদায়ের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেন। তাঁর সময়ে বাংলাদেশ ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়ে ১৯৭৯–৮০ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করে।
৬. Islamic Diplomacy: মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, ফিলিস্তিনের অধিকার, আল-কুদস কমিটি এবং OIC-এর শান্তি উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
৭. Shuttle ও Mediation Diplomacy: ইরান–ইরাক যুদ্ধ বন্ধে OIC-এর Good Offices/Islamic Peace Committee-র সদস্য হিসেবে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেন। তবে বলা ঠিক হবে না যে তিনি যুদ্ধ বন্ধ করেছিলেন—তাঁর উদ্যোগ ছিল মধ্যস্থতামূলক; যুদ্ধ চলেছিল ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত।
৮. Humanitarian Diplomacy: ১৯৭৮ সালের রোহিঙ্গা সংকটকে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে প্রত্যাবাসন কাঠামো তৈরি করেন।
৯. Water Diplomacy: ভারতের সঙ্গে গঙ্গা–ফারাক্কা পানি বণ্টন প্রশ্নে আলোচনা ও চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের পানির স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেন।
মূল্যায়ন
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় অবদান ছিল বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বহুমুখীকরণ, প্রথমবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হওয়া, SAARC-এর ধারণা দেওয়া, মুসলিম বিশ্বে শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি এবং ১৯৭৮ সালের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন।
তবে মনে রাখতে হবে—বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালেই OIC-তে যোগ দেয় এবং চীন ও সৌদি আরব ১৯৭৫ সালেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। অতএব এগুলো জিয়াউর রহমানের শুরু করা নয়; তাঁর কৃতিত্ব ছিল এসব সম্পর্ককে দ্রুত গভীর ও কার্যকর করা। তাঁর পররাষ্ট্রনীতিকে তাই সংক্ষেপে বলা যায়—জাতীয় স্বার্থভিত্তিক বহুমুখী, অর্থনৈতিক ও সক্রিয় ক্ষুদ্ররাষ্ট্রীয় কূটনীতি।