৪৭তম BCS ভাইভা অভিজ্ঞতা (সুপারিশপ্রাপ্ত) প্রশাসন ক্যাডার
*********৪৭তম বিসিএস ভাইভা অভিজ্ঞতা***********
• বোর্ড: অধ্যাপক ড. শাহনাজ সরকার
• পছন্দক্রম: ফরেন, এডমিন, পুলিশ, কাস্টমস, অডিট ও ট্যাক্স।
• তারিখ: ১১ মে (ভাইভা শুরুর ১ম দিন)
• সিরিয়াল: ১৩
(১১ মে কাকতালীয়ভাবে আমার ৪৬তম বিসিএস আনসার ক্যাডারের মেডিকেল টেস্ট ছিল জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালীতে সকাল ৮:৩০ টায়। অপরদিকে সকাল ১০:০০ টায় পিএসসিতে ভাইভা। তাই ভাইভাতে অংশগ্রহণ করতে পারব কিনা অনিশ্চিত ছিলাম। ভাইভাতে অংশগ্রহণ না করারও মানসিক প্রস্তুতি ছিল।)
সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার প্রিয় একজন ছাত্রের বাইকে সাভার থেকে মহাখালী রওনা হলাম। মেডিকেল টেস্ট ৮:৩০ মিনিটে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ডাক্তার আসেননি। বয়স্ক একজন অফিস সহকারীকে ভাইভার কথা জানালাম, ৫০ জনের মধ্যে আমার সিরিয়াল ৪৭। তিনি আশ্বাস দিলেন স্যার এলেই সর্বপ্রথম আমাকে পাঠাবেন। ৯:১৫ বাজে তখনও স্যার আসেননি; কোনো উপায় না পেয়ে সহকারীকে ডকুমেন্ট জমা দিয়ে বললাম, "ভাইভা দিয়ে আবার আসব, আমাকে মহাখালী হতে আগারগাঁও পিএসসিতে যেতে হবে, কিছু সময় প্রয়োজন।" এই বলে বের হয়ে পড়লাম ছাত্রের বাইকের পিছনে বসে।
আমি: দুপুর গড়িয়ে ৩:০০ টায় আমার সিরিয়াল আসলো (এত পিছনে আমি ইতঃপূর্বে ভাইভা দিইনি)। বোর্ডের সদস্যগণ তখনও দুপুরের খাবার গ্রহণ করেননি। তাই সম্ভবত বোর্ড কিছুটা তাড়াহুড়া করছিল এবং তাদের মেজাজও কিছুটা উত্তপ্ত ছিল। আমরা ৩/৪ জন ওয়েটিং রুম থেকে পূর্বের প্রার্থীদের ভাইভার কথোপকথন কিছুটা কানে শুনতে পাচ্ছিলাম, যা অনেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে প্রথম উঠলে সিনিয়র ভাই/আপুরা যেভাবে র্যাগ দিতেন তেমন মনে হচ্ছিল। আর ভয়ে আমার গলাও কিছুটা শুকিয়ে আসছিল। তাও সাহস নিয়ে অনুমতি সাপেক্ষে সালাম দিয়ে ঢুকলাম। মনে মনে ভাবলাম, হারানো কিছুই নেই, আমাকে আল্লাহ তায়ালা অনেক দিয়েছেন।
১। চেয়ারম্যান স্যার: আমার নাম, আমার পঠিত বিষয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বলছিলেন। আমি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিচ্ছিলাম। এমন সময় পাশের এক্সটার্নাল স্যার বলে বসলেন, "জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগ আছে? জানতাম না তো!" চেয়ারম্যান স্যার বললেন, "আছে, অনেক আগে থেকেই। আমি ১৯৮৪ সালের ব্যাচ, আমি ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলাম।" চেয়ারম্যান স্যার কৃষি নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন বাকৃবি (BAU) থেকে, তাই হয়তো জাবিতে বায়োলজি ফ্যাকাল্টিতে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলেন, তবে তখন ফার্মেসি বিভাগ চালু হয়নি। প্রকৃতপক্ষে জাবিতে ফার্মেসি বিভাগ চালু হয় ১৯৮৭ সালে। আমি শুধু চুপ করে থাকলাম। এক্সটার্নাল স্যার আরও একটি কথা বললেন—"আমি তো জানতাম জাবি হলো ঝোপঝাড় আর... (একটি নেতিবাচক মন্তব্য)।" আমি কিছু বললাম না। চেয়ারম্যান স্যার বললেন, "আমরা ঐ আলোচনায় না যাই।" এবার আমাকে প্রশ্ন করা শুরু করলেন।
২। চে. স্যার: আপনি ২০১৭ সালে গ্রাজুয়েশন করেছেন, এখন ২০২৬ সাল—এতদিন কী করেছেন?
• আমি: আমার মতো করে বলতে থাকলাম। পূর্বের চাকরির কথা ও বর্তমান চাকরির কথা বললাম, যদিও তাদের সামনে পুলিশ ভেরিফিকেশন ফর্মে সব উল্লেখ আছে।
৩। চে. স্যার: (আমার চয়েজ লিস্ট পড়ে নিজেই শোনালেন, তারপর) আপনি তো ৪৬তম বিসিএসে আনসার ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত, আবার এসেছেন কেন?
• আমি: নিজের মতো করে উত্তর দিলাম। যেহেতু ফরেন প্রথম পছন্দ, তাই দেশের বাইরে নিজ দেশকে তুলে ধরার ওপর ফোকাস করলাম।
৪। চে. স্যার: আপনি কী মনে করেন ফরেন ক্যাডারের জন্য আপনি যোগ্য?
• আমি: নিজের পজিটিভ দিকগুলো বলার চেষ্টা করলাম। সেই সাথে বর্তমান টেকনোলজি, বিগ ডেটা অ্যানালাইসিস, এআই (AI) ইত্যাদির মাধ্যমে বিদেশে আমাদের শ্রমবাজার সম্প্রসারণের বিষয়গুলো রিলেট করলাম।
৫। চে. স্যার: আপনি তো শুধু ঘনঘন চাকরি বদলান।
• আমি: বিষয়টি তেমন নয় বলে বোঝাতে চাইলাম। এক্সটার্নাল স্যার যোগ করলেন, "অনেক জায়গায় চাকরি করলে অভিজ্ঞতা বাড়ে, এটা ভালো দিক।" সাথে বিদেশের প্রসঙ্গ আনলেন। চেয়ারম্যান স্যার উল্টো বলতে থাকলেন, "আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এটা রাষ্ট্রের অপচয়।" চেয়ারম্যান স্যার আমার একাধিক চাকরিতে যোগদান ও ক্যাডার হয়েও আবার ভাইভায় অংশ নেওয়াটা পজিটিভলি নিলেন না। অনেক প্যাঁচালেন, শেষে বললেন, "তবে আপনার রাইট (অধিকার) আছে চাকরি বদলানোর।"
৬। চে. স্যার: আপনার জীবনের একটা ক্রাইসিস মোমেন্ট (Crisis moment) বলুন এবং কীভাবে সেই মোমেন্ট কাটিয়ে উঠেছেন?
• আমি: নিজের মতো করে উত্তর দিলাম। উনি উত্তর নিলেন না। আবার উত্তর দিলাম, তাও উনি খুশি হলেন না। অনেকক্ষণ প্যাঁচানোর পর বললেন, "আপনি প্রশ্ন ধরতে পারেন নাই।" ঠিক আছে বলে ১ম এক্সটার্নাল স্যারের কাছে পাঠালেন।
৭। ১ম এক্সটার্নাল স্যার: একটু আগে বিগ ডেটা বললেন। বিগ ডেটা বলতে কী বোঝেন?
• আমি: উত্তর করলাম। কিছুতেই উত্তর নিলেন না।
৮। ১ম এক্সটার্নাল স্যার: এআই-কে কীভাবে কাজে লাগাবেন ফরেন ক্যাডারে?
• আমি: নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান ও অ্যানালাইসিস, আগাম বিপদ সম্পর্কে আভাষ পাওয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ইত্যাদি বললাম। উনি মাথা নাড়লেন।
৯। ১ম এক্সটার্নাল স্যার: বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে কী কী পরিবর্তন এসেছে?
• আমি: নিজের মতো করে উত্তর করলাম।
১০। ১ম এক্সটার্নাল স্যার: TRIPS চুক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলেন।
• আমি: উত্তর করলাম।
১১। ১ম এক্সটার্নাল স্যার: ফার্মেসির ছাত্র হওয়ায় পরের প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলাম। LDC গ্রাজুয়েশন হলে ওষুধ খাতের ওপর কী প্রভাব পড়বে?
• আমি: উত্তর করলাম।
১২। ২য় এক্সটার্নাল স্যার: (মনে হচ্ছে উনি রেগে আছেন, কর্কশ কণ্ঠে প্রশ্ন শুরু করলেন) আমাদের সীমান্তে পুশ-ইন বা পুশ-আউট সমস্যার কী ব্যবস্থা নেবেন?
• আমি: আমি নিজের মতো বলা শুরু করলাম। উনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, "ডিপ্লোম্যাটের মতো উত্তর দিন।" একূল-ওকূল রক্ষা করে কিছু একটা বললাম।
১৩। ২য় এক্সটার্নাল স্যার: আন্তর্জাতিক বিষয়ভিত্তিক অনেকগুলো থিওরিটিক্যাল প্রশ্ন করলেন। যেমন: বাফার স্টেট কী? আরগুলো মনে নেই।
• আমি: সবগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলাম। স্যারের অভিব্যক্তি কিছুই বুঝলাম না। এরপর আবার চেয়ারম্যান স্যার শুরু করলেন।
১৪। চে. স্যার: আমি লক্ষ্য করলাম, আপনি স্যারের (২য় এক্সটার্নাল) প্রশ্নগুলোর উত্তরে উনাকে সন্তুষ্ট করতে পারলেন না।
• আমি: মাথা নেড়ে স্বীকার করলাম। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, তবে আমার ইংরেজি স্পিকিং ফ্লুয়েন্সিতে (Fluency) একটু সমস্যার কথা অকপটে জানালাম।
১৫। চে. স্যার: চয়েজ দিয়েছেন তো ফরেন, এটা বললে হবে? (আবার প্রশ্ন শুরু করলেন) মধ্যপ্রাচ্যে আপনাকে ফরেন ক্যাডারের মাধ্যমে নিযুক্ত করলে কী কী করবেন? দ্রুত বলেন, সময় কম।
• আমি: রেমিট্যান্স শব্দ বলার পর আর কোনো কথা বলতে না দিয়ে পরের প্রশ্নে গেলেন।
১৬। চে. স্যার: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে কে জয়ী হয়েছে? ডিপ্লোম্যাটের মতো উত্তর দিন।
• আমি: কৌশলগতভাবে ইরান, তবে... (আর বলার সুযোগ দিলেন না)।
১৭। চে. স্যার: আপনাকে ইরানের রাষ্ট্রদূত করলে কী করবেন? (তখন জ্বালানি সমস্যা চলছিল, হরমোজ প্রণালী বন্ধ আর ওদিকে পাকিস্তানসহ বেশ কিছু দেশের অয়েল ট্যাংকার ইরান হরমোজ পার হতে দিচ্ছিল না)
• আমি: জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করব। (আর কিছু বলার সুযোগ দিলেন না)।
১৮। চে. স্যার: আবারও আগের প্রসঙ্গ—আপনি তো শুধু চাকরি বদলান, রাষ্ট্রের অপচয়।
• আমি: চুপ থাকলাম।
১৯। চে. স্যার: এবার তিনি আমার জমা দেওয়া পাসপোর্ট সাইজের ছবি নিয়ে পড়লেন। "আপনার ছবি আর ভোটার আইডি কার্ডের ছবি তো একই রকম!"
• আমি: আমি বললাম, "ভোটার আইডি কার্ডের ছবি তো এইচএসসির সময় ওঠানো। আর সাধারণত ভোটার আইডি কার্ডের ছবিতে কাউকে সঠিকভাবে চেনা যায় না।" (ভোটার আইডি কার্ডের ছবি যে কারা ওঠায়! এর মতো বাজে ছবি আমার বিশ্বাস কেউ ওঠায় না)
২০। চে. স্যার: এবার আমার ছবি আর অ্যাপ্লিক্যান্ট কপির (মূলত ঐটা ফটোকপি) ছবি মিলিয়ে প্রশ্ন করলেন, "একই শার্ট, একই ব্যাকগ্রাউন্ড কেন?"
• আমি: বললাম, "একই শার্ট পরে আমার বাসার দেওয়ালে দাঁড়িয়ে মোবাইল দিয়ে আমার স্ত্রী ছবি তুলে দিয়েছে আর আমি নিজে এডিট করেছি, তাই ছবির সবকিছুর মিল আছে। তবে স্যার, ছবি সাম্প্রতিক সময়ের।"
২১। চে. স্যার: যাইহোক আপনি যখন বলছেন, তাহলে ঠিক আছে।
• আমি: চুপ করে থাকলাম। (মনে মনে ভাবছি, এটা আমার বিসিএস-এর ৫ নম্বর ভাইভা, পূর্বে কখনও ছবি নিয়ে এমনভাবে বেজ্জতি হইনি)
২২। চে. স্যার: "শুধু চাকরি ছাড়েন" বলে আবার কথা শুনিয়ে বিদায় জানালেন।
• আমি: আমার মূল সনদগুলো নিয়ে সালাম দিয়ে বেরিয়ে গেলাম।
নিজের মূল্যায়ন:
ভাইভা আমার দৃষ্টিতে জঘন্য হয়েছিল। পুরো ভাইভা ইংরেজিতে হয়েছিল। ইংরেজি স্পিকিংয়ে আমার কিছুটা জড়তা ছিল। আর ফরেন ক্যাডার প্রথম চয়েজে আবেদনের সময় হতাশা আর শখের বশে দিয়েছিলাম; অন্য সকল বিসিএসে প্রশাসন প্রথম চয়েজে দেওয়া থাকত। পুরো ভাইভায় আমার কোনো উত্তর তেমন গ্রহণ করেনি আর আমিও তেমনভাবে গুছিয়ে ইংরেজিতে বলতে পারিনি, আবার অনেক ক্ষেত্রে আমাকে উত্তর দেওয়ার সুযোগই দেওয়া হয়নি। প্রচন্ড মানসিক চাপ আর অনেকটাই দুর্ব্যবহার (তুচ্ছতাচ্ছিল্য) করেছেন। তবে আমি প্রথম থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম—ক্যাডার হওয়ার পর আবার ভাইভা বোর্ডে গেলে এমন আচরণ করবেই, আর স্যারদের তুলনায় ম্যামদের কখনো উত্তর দিয়ে আমি সন্তুষ্ট করতে পারব না, পূর্ব অভিজ্ঞতা আমাকে তাই বলে।
মোঃ জাহেদ হাসান
সহকারী ব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ কর্পোরেশন (পেট্রোবাংলা) (KGDCL)-এ বর্তমানে কর্মরত।
৪৪তম নন-ক্যাডার: সহকারী মহাপরিদর্শক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত (কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর)
৪৬তম বিসিএস: আনসার ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত
৪৭তম বিসিএস: প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত
Free
৪৭তম বিসিএস রিয়েল ভাইভা অভিজ্ঞতা - ৩৫